মাথার উপর ঢেউ খেলানো কৃষ্ণ বুনন,যা মধ্যগগনের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে সেজে আছে। হৃদয় শীতল করা বাতাসে তা দোল খাচ্ছে সদ্য তোলা পালের মতো। চিত্রা হরিণীর ন্যায় টানা দুটো চোখের মায়ায় কি কেউ পড়েনি কখনো? কতটা চমকপ্রদভাবে সাজানো দুই চোয়ালের দেয়ালে মুক্তোদানার ন্যায় বাঁধানো সেই দন্তরাশি। হাজারো স্বাধ কে আলাদাভাবে পরখ করে দেখার জন্য যে,জিহ্বাটা কর্মরত তার কথা ভুলে গেলে কি চলবে? যে হস্তদ্বয় আহার জোগায় সেই মহীয়সী জননীর। বধুবেশে এসে যে,মেয়েটি আমাকে পূর্ণতা দিয়েছে জীবনের। প্রাণাধিক প্রিয় কলিজার সেই সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে যে,অন্ন প্রাপ্তিতে,তাতো সেই দুটি হাতের কল্যাণেই। এক জোড়া জুতো নেই বলে শত অভিযোগ ভাগ্যবিধাতার তরে। কখনো কি সেই ভাবনাটার উদয় হয়েছে মাথায়,যার দুটি পা’ ই নেই,সে কোন বহাল তবিয়তেই বা আছে? এভাবে বর্ণনা দিলে হয়তো যার নামে মাত্র ক্ষণেই ইতি টানতে হবে। কারণ এ বর্ণনা তো কখনো শেষ হবার নয়। অনন্তকাল হয়তো তার পরিসমাপ্তির ঘোষণা দেবে। কিন্তু তার বর্ণনার সেই ভাষাতো সীমাহীন শব্দের রাজ্য ভাণ্ডার নিয়ে গঠিত। কতটা আয়োজন করে যে,মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন,তা কোরআনের সেই কৃষ্ণবর্ণগুলো সাক্ষী দিচ্ছে গত চৌদ্দশত বছর যাবত।
এর জন্য কখনো তাকে তার প্রাপ্য শুকরিয়া টুকুন জানোনা হয়নি কখনও। কি দেননি তিনি! বটবৃক্ষের ছায়াতুল্য বাবা দিয়েছেন। দিয়েছেন মায়া-মমতার এক রহস্যময় মানবী “মা”। অসময়ের এক দুর্দান্ত সাথী,সহোদর দিয়ে যেনো ঋণের বোঝাটা আরেকটু ভারি করে দিলেন। বোন নামক স্নেহের ও আদরের কিংবা ভালোবাসার একটা সমুদ্র দিয়ে যেনো করযের,পূরণ টা করতে দিতেই নারাজ তিনি। তবুও,শত অভিযোগ যেন তারই সমীপে। অথচ তিনি বলছেন,”ধরণীর বুকে বিরাজমান সবগুলো বৃক্ষরাজিগুলো যদি তোমাদের সামনে কলম হিসেবে প্রেরণ করা হয়। আর প্রবাহমান সকল সমুদ্রের জলরাশীগুলো কালি হিসেবে দেওয়া হয়,তবে ফুরিয়ে যাবে সমুদ্রের সকল জলরাশী ও বৃক্ষকুল। তবুও তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করে ইতি টানা যাবেনা।” [সুরা কাহাফঃ ১০৯]
এ আয়াতসমূহ প্রমাণ করছে যে,আল্লাহর কালেমাসমূহ কখনও শেষ হবার না। অথচ আমাদের সকল অভিযোগের তীর যেনো তারই দিকে।
আমাদের মধ্যে প্রায় কমন একটা অভিযোগ দেখা যায়। আমি সাধ্যমতো আল্লাহ প্রদত্ত বিধানাবলী মেনে চলার চেষ্টা করি। তবুও অভাব যেনো আমার পিছু ছাড়ছেনা। আমার চাহিদাগুলো অজানা কোনো এক কারণে আল্লাহর দরবারে পূরণ হচ্ছেনা।
প্রিয় পাঠক! এমনওতো হতে পারে,মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই আকুতিমিশ্রিত চাওয়া গুলোকে পূর্ণতা দিতে আরও একটু সময় নিতে চান এটা দেখার জন্যে যে,সেই অবিনশ্বরের প্রতি কতটুকুন বিশ্বাস আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট আছে। হতে পারে আমাদের এই হৃদয় নিংড়ানো আকুলতা তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি চান তাঁর সবচেয়ে আদরের সৃষ্টি মানুষ তাকে আরও কিছুটা সময় একান্তে স্বরণ করুক। অথচ আমাদের মধ্যে যেনো কেবলই তাড়াহুড়ো। অথচ তাড়াহুড়ো কখনও কোনো সফলতা বয়ে আনতে পারেনা। আর তিনি তাঁর সৃষ্টিকূলের মাঝে মানবজাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে সম্মানিত করেছেন।
এবং পুরো ভূপৃষ্ঠকে তার জন্য পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে দিয়েছেন। আমাদের রব বলছেন,”আমি তোমাদের কে অবশ্যই পরীক্ষা করব,কিছু ভয়,ক্ষুধা, এবং ধন-সম্পদ,জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদের মধ্যে যারা ধৈর্যশীল।” [সুরা বাকারাহ ১৫৫।]
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে আমাদের প্রেরণ করেছেন কেবলমাত্র তারই ইবাদাত করার জন্য। এবং এই ইবাদাত করাকালীন অসংখ্য পরীক্ষা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে তাঁর বান্দার উপর আসবে। আর এই পরীক্ষার সিলেবাস সেই চৌদ্দশত বছর পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা পবীত্র কোরআনুল কারিমে প্রনয়ণ করেছেন। সুতরাং যে কোনো মুহুর্তে আল্লাহর পক্ষ হতে সেই পরীক্ষা আসতে পারে। এবং প্রকৃত মুমিনের উচিৎ যেন সে সেই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তির্ণ হতে পারে সেজন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা। (তবে কোনো মতেই আল্লাহ তায়ালার নিকট পরীক্ষা কামনা করা মোটেও উচিৎ নয়। বরং এটা যেন একপ্রকার দুঃসাহসিকতার পরিচয়।)
কেননা,কোন বিপদে পতিত হওয়ার আগেই যদি সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে দেয়া হয়,তবে সে বিপদে ধৈর্যধারণ সহজতর হয়ে যায়। আর হঠাৎ করে বিপদ এসে পড়লে পেরেশানী অনেক বেশী হয়। যেহেতু আল্লাহ্ তাআলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করেই পরীক্ষার কথা বলেছেন,সেহেতু সবার পক্ষেই অনুধাবন করা উচিত যে,এ দুনিয়া দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। সুতরাং এখানে যেসব সম্ভাব্য বিপদ-আপদের কথা বলা হয়েছে,সেগুলোকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে না করলেই ধৈর্যধারণ করা সহজ হতে পারে। পরীক্ষায় সমগ্র উম্মত সমষ্টিগতভাবে উত্তীর্ণ হলে পরে সমষ্টিগতভাবেই পুরস্কার দেয়া হবে;এছাড়াও সবর-এর পরীক্ষায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা যতটুকু উত্তীর্ণ হবেন, তাদের ততটুকু বিশেষ মর্যাদাও প্রদান করা হবে। মূলত: মানুষের ঈমান অনুসারেই আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। হাদীসে এসেছে,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,”আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা,বিপদাপদ-বালা মুসিবত নবীদেরকে প্রদান করেন। তারপর যারা তাদের পরের লোক,তারপর যারা এর পরের লোক,তারপর যারা এর পরের লোক। ” [মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩৬৯]
অর্থাৎ প্রত্যেকের ঈমান অনুসারেই তাদের পরীক্ষা হয়ে থাকে। তবে পরীক্ষা যেন কেউ আল্লাহ্র কাছে কামনা না করে। বরং সর্বদা আল্লাহ্র কাছে নিরাপত্তা কামনা করাই মুমিনের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক লোককে বলতে শুনেছেন যে,“হে আল্লাহ্! আমাকে সবরের শক্তি দান কর। তখন তিনি বললেন,তুমি বিপদ কামনা করেছ,সুতরাং তুমি নিরাপত্তা চাও। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৩১,২৩৫]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,মুমিনের উচিত নয় নিজেকে অপমানিত করা। সাহাবায়ে কিরাম বললেন,কিভাবে মানুষ নিজেকে অপমানিত করে? রাসূল বললেন,এমন কোন বালা-মুসিবতের সম্মুখীন হয় যা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই”। [তিরমিযী: ২২৫৪]
সুতরাং ধৈর্য হারালে চলবে না। সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নিকট। আল্লাহ তায়ালা বলছেন,”হে ঈমানদারগণ! তোমরা সাহায্য চাও সবর ও সালাতের মাধ্যমে। নিশ্চয় আল্লাহ্ তায়ালা সবরকারীদের সাথে আছেন” [সুরা বাকারাহঃ ১৫৩] এবং নিরাশ হওয়া যাবেনা। নিরাশ হওয়া আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য নিষেধ করা হয়েছে। প্রকৃত মুমিন কখনো নিরাশ হতে পারেনা। বান্দা যখন কোনো আশার আলো না পেয়ে নিরাশ হয়ে ডিপ্রেশনে ভোগে। ঠিক তখনই যেনো আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার জন্য আলোর মশাল জ্বেলে দেন। তাঁর বান্দার কর্ণকুহরে তিনি এই কথা পৌঁছে দিতে চান স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হলে হতাশ হওয়া যাবে না। ব্যর্থতার পরই আসবে সফলতা। যেমনিভাবে রাত পোহালেই আসে দিন। আর ব্যর্থতায় মর্মাহত লোকদের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলেন,”তোমরা হতাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও”। [সূরা আলে ইমরান : ১৩৯]
হতাশ হতে বারণ করেছে ইসলাম। যারা জীবনের প্রথম পর্যায়ে খারাপ কাজ করেছে পরবর্তী সময়ে নিজের কৃতকর্মের কথা স্মরণ করে মর্মপীড়ায় ভুগছেন,তাদেরও আল্লাহতায়ালা নিরাশ করেননি। তিনি তাদের সুপথে ফিরে আসার জন্য ক্ষমার সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন,”তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সব গোনাহ মাফ করবেন। তিনি ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু”। (সূরা যুমার : আয়াত ৫৩)।
অনেকে হতাশ হয়ে হরেক রকম নেশায় জড়ায়। এতে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায় কিন্তু হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। নেশা জাতীয় যে কোনো দ্রব্য সেবন করা ইসলামে হারাম। তাই যারা পাওয়া,না-পাওয়া নিয়ে জীবনে হতাশ হয়ে পড়েছেন, তাদের উচিত নেশা না করে ধৈর্য ধারণ করা এবং নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। কেননা ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আল্লাহ তায়ালার সম্পর্কটা ঈর্ষনীয়। এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহ বলেন,হে ইমানদারগণ,তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সূরা বাকারা : ১৫৩)।
আর আল্লাহতায়ালা যাদের সঙ্গে আছেন,তাদের দুঃখ-কষ্ট ঘায়েল করতে পারে না। রাসূল (সা.) হতাশাগ্রস্ত মানুষকে মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্য কয়েকটি আমলের নির্দেশ দিয়েছেন। যা তাদের মনকে সজীব ও সতেজ করবে।
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে কিছু দোয়া আছে,আশা করা যায়, যে ব্যক্তি ওইগুলো পড়ে আমল করবে,সে কখনও নিরাশ বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আমলগুলো তেত্রিশবার তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পড়া,তেত্রিশবার তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) পাঠ করা এবং চৌত্রিশবার তাকবির (আল্লাহু আকবার) পড়া। (সহিহ মুসলিম)
আমাদের উচিত সাময়িক ব্যর্থতা। বাধা-বিপত্তি, ও পাওয়া, না-পাওয়ার বেদনায় হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ভরসা করা। কেননা তিনি আমাদেরকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন “আমি কি আমার বান্দার জন্য যথেষ্ট নই?”[সুরা যুমারঃ ৩৬]
এর সবথেকে গ্রহণযোগ্য উত্তর পাবেন নিজের বিবেকের কাছে।
সুতরাং বিপদে-আপদে আল্লাহ তায়ালার প্রতি তীর্যক বা ব্যাঙ্গাত্তক কথা না বলে,তাঁর কাছে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা এবং ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে সেই সাহায্য আসার জন্য অপেক্ষা করা। এবং তাঁর দেয়া সকল নেয়ামতের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা তথা শুকরিয়া আদায় করা। তবেই বিদায় নেবে জীবনের যত উৎকণ্ঠা।
– লেখক, শিক্ষার্থী ।