এহসানুর রহমান
এবারের রোজার মাস একেবারেই অন্যরকম। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করতে ঘরবন্দী অবস্থায় রোজা পালন করতে হচ্ছে। কিন্তু ঘরবন্দী এই সময় নিষ্ক্রিয় থেকে বাতের ব্যথা বাড়তে দেওয়া যাবে না। হাঁটু ব্যথার ক্ষেত্রে সাহায্য নিতে পারেন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীন এবং স্বতন্ত্র চিকিৎসা পদ্ধতি এটি। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক রোগীর বাতের ব্যথা নির্ণয় করে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা মানে কিন্তু কেবল আলট্রাসাউন্ড থেরাপি নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন বিভিন্ন থেরাপিউটিক এপ্রোচের মাধ্যমে জয়েন্ট স্পেস বৃদ্ধি করার পাশাপাশি হাঁটুর মাংসপেশির স্ট্রেচিং এবং স্ট্রেন্দেনিং প্রোগ্রাম। হাঁটু ব্যথার বিভিন্ন কারণ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হাঁটুর বাত বা অস্টিও আর্থ্রাইটিস। ড. জন পস্নেট ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করেন যে; উন্নত দেশগুলোতে যেমন ফ্রান্সে ৫.২ শতাংশ, ইতালিতে ৫.৪ শতাংশ, ইংল্যান্ডে ১০.২ শতাংশ এবং স্পেনে ১০.২ শতাংশ মানুষ হাঁটুর বাত বা অস্টিও আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত। যাদের মাঝে মহিলা এবং বয়ঃবৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। চারটি দেশের মোট ২০৭৩ জন রোগীর উপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে এদের মাঝে ৬৯.৭ শতাংশ মানুষ শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। অস্টিও আর্থ্রাইটিস হলে শুধু যে হাড় ক্ষয় হয় তা নয়, অস্থিসন্ধির চারপাশের মাংসপেশী, লিগামেন্ট, মেনিসকাস ও জয়েন্ট ক্যাপসুল আক্রান্ত হয়। হাঁটুর এই রোগটি হলে পায়ের বড় বড় মাংসপেশি বিশেষ করে কোয়াড্রিসেপ্স, হ্যামস্ট্রিং এবং হিপের মাংসপেশির ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শক্তি কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাংসপেশি শুকিয়েও যায়, যা মানুষের স্বাভাবিক হাঁটা এবং চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। শারীরিক চলাচলের অক্ষমতার সব ধরনের রোগের ভয়াবহতার মধ্যে বিশ্বব্যাপী হাঁটুর ব্যথাকে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। গবেষণা মতে, হাঁটু ব্যথায় বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন ওষুধ, সার্জারি ইত্যাদি প্রয়োগ করা হয়ে থাকলেও এসব জনগোষ্ঠীর ২৫-৩০ শতাংশ মানুষ ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৮০শতাংশ মানুষ হাঁটুর ব্যথা নিয়েই থাকেন। ব্যথা নিরাময়ে ৯০ শতাংশ রোগী ব্যথানাশক ঔষধ খাচ্ছেন যার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ফলে মানবশরীরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অঙ্গ যেমন লিভার বা কিডনির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অস্থিসন্ধির কার্যক্ষমতা বাড়াতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার কোনও বিকল্প নেই।
হাঁটু ব্যথার কারণ
গবেষণায় দেখা যায়, পুরো পৃথিবীর ১৫% লোক হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিস রোগে ভোগেন। বিশেষ করে ৫৫ বছরের উপরে নারীরা অনেক বেশি ভোগেন এই ব্যথায়। মাসিক পরবর্তী এস্ট্রোজেন হরমোনের অভাবে অস্টিওপোরোসিস নামক একটি হাড় ক্ষয় রোগ হয়। হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিস পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি হয়। যাদের বিএমই (বডি মাস ইন্ডেক্স) বেশি তাদের হাটু ব্যথার ঝুঁকি বেশি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের (বিএমআই) ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ থাকা স্বাস্থ্যকর (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী)। বিএমআই ২৪.৯ এর বেশি হওয়া মানে রোগীর মাঝে মুটিয়ে যাওয়ার লক্ষণ রয়েছে। রোগী যদি তার ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন সেক্ষেত্রে সব চিকিৎসা পদ্ধতিই ব্যর্থ হবে। হাঁটুর কার্টিলেজ ক্ষয় হয়ে যাওয়া হাঁটু ব্যথার অন্যতম কারণ। এছাড়াও মেনিস্কাস ইনজুরি, লিগামেন্ট ইনজুরি, হাড়ক্ষয়, বায়োমেকানিক্সের সমস্যা, খেলাধুলাজনিত আঘাত, মাংসপেশির দুর্বলতা, মানসম্মত জুতা ব্যবহার না করা, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব কিংবা অন্য কোনও রোগের কারণেও ব্যথা হতে পারে।
করোনা পরিস্থিতিতে হাঁটুর ব্যথায় করণীয়
লেখক: ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট,
সি আর পি, সাভার, ঢাকা।