সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী সিআইখোলা এলাকায় মা নাজমিন বেগম (২৬) ও দুই মেয়ে নুসরাত (৮) ও সুনাইনা ওরফে সায়মা (২)কে গলাকেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার ঘটনার করার ঘটনায় অভিযুক্ত একমাত্র আসামী নিহত নাজমিন বেগমের বড় বোনের স্বামী ঘাতক আব্বাস উদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ মিল্টন হোসেন আদালতে হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ কোর্ট ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) মোঃ আসাদুজ্জামান। এদিকে নিহত মা ও দুই মেয়ের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে নিহত নাজমিনের স্বামী সুমন মিয়ার সুমিলপাড়ার বাবার বাড়িতে শুক্রবার বিকেলে ৩টায় নিয়ে আসে। পরে বাদ আছর তাদের তিনজনের জানাজা শেষে আদমজী করবস্থান দাফন করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুল হক জানান, সিদ্ধিরগঞ্জে সিআইখোলা এলাকার আনোয়ার হোসেন ছয়তলা বাড়ির ষষ্ঠ তলার পূবর্ দিকের ফ্লাটে বৃহস্পতিবার সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার দিকে নাজমিন বেগমের বড় বোন ইয়াছমিন বেগমের স্বামী আব্বাস উদ্দিন ফ্লাটে ঢুকে নাজমিন বেগম, তার দুই মেয়ে নুসরাত (৮) সুনাইনা ওরফে সায়মা (২)কে উপর্যপুরি ছুরিকাঘাত এবং গলাকেটে হত্যা করে। হত্যার বিষয়টি দেখে ফেলায় আব্বাস উদ্দিন নিজের প্রতিবন্ধি মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় নিহত নাজমিন বেগমের স্বামী সুমন মিয়া বাদি হয়ে ভায়রা আব্বাস উদ্দিনকে আসামী করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় বৃহস্পতিবার রাতেই মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ শুক্রবার দুপুরে আদালতে নিয়ে আসলে আব্বাস উদ্দিন ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি প্রদানে রাজি হয়। পরিদর্শক আব্দুল আজিজ আরো বলেন, শুক্রবার দুপুর একটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ মিল্টন হোসেনের আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে ঘাতক আব্বাস উদ্দিনকে আদালত জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলায় সুমন উল্লেখ করেন, তার স্ত্রীর বড় বোন ইয়াসমিনের সাথে স্বামী আব্বাসের দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কলহ চলছিল। বিভিন্ন সময় এই কলহের কারণে তার স্ত্রী নাজমিনের বড় বোন ইয়াসমিনের পক্ষ নিয়ে কথা বলায় আব্বাসের সাথে মনোমালিন্য হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে আব্বাস ও তার স্ত্রী ইয়াসমিনের ঝগড়া হলে বাদী সুমনের শ্যালক হাসান বড় বোনের স্বামী আব্বাসকে কিল ঘুষি মারে এবং পরদিন সকালে হাসান তার বড় বোন ইয়াসমিন ও তার মেয়ে সুমাইয়াসহ সুমনের বাসায় বোন নাসরিনের কাছে চলে আসে। ১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টায় সুমন কর্মস্থল সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক জোনাকী পেট্রোল পাম্প থেকে মিজমিজি সিআইখোলাস্থ আনোয়ার মালিকানাধীন ৭তলা ভবনের ৬ তলার ফ্ল্যাট বাসায় এসে স্ত্রী ও সন্তানদের গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ এবং তার স্ত্রীর বড় বোনের প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়াকে (১৫) রক্তাক্ত আহত অবস্থায় খাটের উপর জীবিত দেখতে পায়। পরে ঘটনাটি তার শ্যালক হাসানকে ফোন করে জানালে কর্মস্থল থেকে তার শ্যালক হাসান ও স্ত্রীর বড় বোন বাসায় আসে এবং হাসান জরুরী ভিত্তিতে সুমাইয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বৃহম্পতিবার রাতে নগরীরর মাসদাইর নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন্সে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, হত্যাকান্ডে সংগঠিত হওয়ার মাত্র ৬ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার স্টেশন সংলগ্ন একটি কমিউনিটি সেন্টারে খাবার টেবিলের নীচ থেকে একমাত্র আসামী নিহত নাজমিন বেগমের বোনের জামাই আব্বাস উদ্দিনকে গ্রেফতর করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে গত মঙ্গলবার স্ত্রী ইয়াসমিনের সাথে আব্বাসের ঝগড়া হয়। ওই ঝগড়ার জের ধরে শ্যালক নাছির উদ্দিন আব্বাসকে কিল ঘুষি মারে এবং স্ত্রী ইয়াসমিন রাগ করে ছোট বোনের বাসায় চলে যায়। এই ক্ষোভ থেকে সে শ্যালিকা নাজমিন বেগম, তার দুই মেয়ে নুসরাত ও খাদিজা এবং নিজের মেয়েকে কুপিয়ে চলে যায়। এতে ঘনাস্থলেই মা মেয়ে সহ তিনজন নিহত হয়। আহত প্রতিবন্ধি সুমাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পেট্রোল পাম্পে রাতে ডিউটি শেষ সকাল দশটার দিকে বাসায় এসে স্বামী মো: সুমন রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে তিনজনের নিথর দেহ এবং প্রতিবন্ধি সুম্ইায়াকে আহত অবস্থায় দেখতে পায়। তার কান্নাকাটির শব্দে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এসে আহত সুমাইয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে শুক্রবার দুপুরে নিহতদের লাশের ময়না তদন্ত শেষে তিনজনের লাশ আতœীয় স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রসঙ্গতঃ বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং ওয়ার্ডের সিআই খোলা এলাকার আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন সাত তলার ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে নৃশংস ওই হত্যাকানেডর ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো সুমন মিয়ার স্ত্রী নাজমিন বেগম (২৮), তাঁর মেয়ে নুসরাত (৮) ও সুনাইনা ওরফে সায়মা (২)। গুরুতর জখম নাসরিনের বোন ইয়াসমিনের মেয়ে সুমাইয়াকে (১৫) আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।