ইউরোপের সবচেয়ে উন্নত দেশ যুক্তরাজ্য। সমৃদ্ধ দেশটিতে উন্নত জীবনের আশায় ঘর ছেড়েছিল তারা। কিন্তু ৩১ পুরুষ আর ৮ নারীর সেই স্বপ্ন ট্র্যাজেডিতে শেষ হয়েছে। চলতি সপ্তাহে দেশটির এসেক্সের শিল্পাঞ্চলে একটি ফ্রিজ লরির মধ্যে পাওয়া যায় তাদের।
একেবারে বরফ হয়ে গিয়েছিল তাদের দেহগুলো। সবাই চীনা নাগরিক। মর্মান্তিক এ ঘটনায় একটি হত্যা তদন্ত শুরু করেছেন বেলজিয়ামের সরকারি আইনজীবীরা।
জড়িতদের ধরে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। কিন্তু একটা প্রশ্ন অনেককেই ভাবাচ্ছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নাগরিক হয়েও এমন পথে পা বাড়ালেন কেন তারা।
আর কিভাবে বা কাদের হাত ধরে তারা ৫ হাজার মাইলের বন্ধুর পথ পাড়ি দিলেন।
গত কয়েকদিন ধরে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। মূলত দারিদ্র্যপীড়িত জীবন থেকে মুক্তি পেতেই শত বিপদের সম্ভাবনা জেনেও মাতৃভূমি ছেড়ে পালাচ্ছেন লাখ লাখ চীনা। আর এক্ষেত্রে ‘স্নেকহেড’ নামে কুখ্যাত মানব পাচার চক্রের সহায়তা নিচ্ছে। নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত চীনের ত্রিয়াদ গ্যাংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে এদের।
চলতি সপ্তাহের লরি ট্র্যাজেডির জন্য এ স্নেকহেড চক্রই দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের শহর, বন্দর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত অনেকটা ওতপেতে থাকে গ্যাংয়ের সদস্যরা। গরিব ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোকে উন্নত জীবনের টোপ দেয় তারা। ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বের করে পশ্চিমা দেশগুলোর পথে নেয়।
কখনও বাসে, কখনও ট্রেন, আবার কখনও করে ভয়ংকর সব রুট ব্যবহার করে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। এজন্য মাথাপিছু ‘সার্ভিস চার্জ’ নেয় ৩০ হাজার পাউন্ড। ডেইলি মিরর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, স্নেকহেড গ্যাংয়ের বহু নেতা-উপনেতা রয়েছে।
প্রধান নেতাদের একজনের নাম জিং পিং চেন। এ নারী সিস্টার পিং বলেও পরিচিত। স্নেকহেডের সবচেয়ে ভয়ংকর নেতা হিসেবে ইউরোপজুড়ে তার পরিচিত।
এজন্য অনেকেই তাকে ‘মাদার অব অল স্নেকহেডস’ বলে ডাকে। শুধু যুক্তরাজ্যে মানুষ পাচার করেই কোটি কোটি পাউন্ড কামিয়েছেন তিনি। চীনের ফুজিয়ান অঞ্চলের গরিবরাই তার বড় টার্গেট। টাকা-পয়সা চুকিয়ে নেয়ার পরই ইউরোপে চালান করেন সিস্টার পিং।
১৯৮০র দশক থেকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরতর করে বেড়ে চলেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পরই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। বড় বড় শহর তৈরি হচ্ছে। বিলিয়নিয়রের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহের ঘটনা এর অর্থনীতির অন্ধকার অংশেও আলো ফেলেছে।
দেশটির বড় বড় শহরগুলোর বাইরে প্রায় ৩ কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। বঞ্চিত ও নিঃস্ব এ মানুষগুলো সাধারণত মরু কিংবা আধা-মরু অঞ্চলে বাস করেন। জীবিকার জন্য প্রধানত কৃষির ওপরই নির্ভরশীল এরা।
অন্যরা শহরের উপকণ্ঠে বস্তিতে বাস করেন। ধনী-গরিবের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ না হওয়ায় সহায়-সম্বল বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এদের অনেকেই।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে, বিশ্বে বর্তমানে ২৮ কোটি ৮০ লাখ অভিবাসী রয়েছেন। এর মধ্যে ১ কোটিই চীনা। এর মধ্যে ২৫ লাখ বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রে, ৭ লাখ ১২ হাজার কানাডায়।
খবর দৈনিক যুগান্তরের।