বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই মেয়াদে দীর্ঘ ১০ বছর ৪১ দিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর অবশেষে সোমবার (২৪ এপ্রিল) বঙ্গভবন ছাড়লেন সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। অপরদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। সোমবার বেলা ১১টায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের পর ক্ষমতা হস্তান্তর করে বঙ্গভবন থেকে সস্ত্রীক বিদায় নেন আবদুল হামিদ। এ সময় বঙ্গভবনে তাকে দেওয়া হয় বিদায়ী গার্ড অব অনার। লাল গালিচা সংবর্ধনার পাশাপাশি পুষ্পশোভিত গাড়িতে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে বিদায় জানানো হয় তাকে। প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রপতি এমন রাজসিক আয়োজনে বঙ্গভবন ছাড়লেন।
বঙ্গভবনের দরবার হলে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন শপথ নেওয়ার পর চেয়ার বদলের মাধ্যমে তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সারেন বিদায়ী রাষ্ট্রপ্রধান আবদুল হামিদ। কিছুক্ষণ পর বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল মাঠে শুরু হয় তার বিদায় পর্ব। সোমবার বেলা ১টার পর শুরু হওয়া এই বিদায় অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের সুসজ্জিত একটি দল বিদায়ী গার্ড অব অনার দেয় আবদুল হামিদকে। অগ্রভাগে ঝাণ্ডা হতে অশ্বারোহী দল, তাদের পেছনে তিন বাহিনীর ব্যান্ড দল বাদ্যযন্ত্রে তুলছিল দেশাত্মবোধক গানের সুর। এর পর তিনি লাল গালিচায় হেঁটে গার্ড পরিদর্শন করেন।
গার্ড অব অনার পর্ব শেষে আবদুল হামিদ ও তার সহধর্মিনী রাশিদা খানম উঠেন ফুল দিয়ে সাজানো একটি খোলা জিপে। বঙ্গভবনের বক ফোয়ারা থেকে প্রতীকী কায়দায় সেই ‘প্যারেড কার’কে দুটি রশি ধরে মূল ফটকে টেনে নিয়ে যান বঙ্গভবনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরারা। ধীর গতিতে গাড়ি এগোনোর সময় দুই পাশ থেকে ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন বঙ্গভবনের কর্মীরা। আবদুল হামিদ হাত নেড়ে জবাব দিচ্ছিলেন অভিবাদনের।
খোলা জিপটি বঙ্গভবনের মূল ফটকে পৌঁছালে আবদুল হামিদ ও রাশিদা খানম একটি কালো রঙের গাড়িতে উঠেন। সেখানে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের তত্ত্বাবধায়নে মোটর শোভাযাত্রা করে তারা পৌঁছান নিকুঞ্জে তাদের বাড়ি রাষ্ট্রপতি লজে। বাড়িতে প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি। বলেন, তার যেটুকু সাফল্য, সেজন্য তিনি দেশের মানুষের কাছে, এলাকার মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, সেজন্য তার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। আর কৃতজ্ঞ সাংবাদিকদের কাছে, কারণ তার বক্তব্য তারা টুইস্ট না করে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, এই যে রোদের মধ্যে আপনারা এসেছেন, আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের জন্য। যদিও আমি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলাম, কিন্তু তার পরও আমি সব সময় নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ মনে করি। আমার যে রাজনীতি, সেটা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। চেষ্টা করেছি দেশে সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে, আগামীতেও চেষ্টা থাকবে। দেশের মানুষ সব দিক থেকে ভালো থাকুক, সুখী থাকুক সেটি চাই।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের মার্চ মাসে অস্থায়ী এবং ২৪ এপ্রিল প্রথম দফায় দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন কিশোরগঞ্জের সন্তান আবদুল হামিদ। এরপর ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ২১তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি।
অবসরে যা করবেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় দেশের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করার পর আজ সোমবার (২৪ এপ্রিল) থেকে ভারমুক্ত হলেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এদিন বেলা ১১টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর পরই আবদুল হামিদকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার সময় গণমাধ্যমের কাছে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। এ সময় তিনি বলেন, ঘরে বসে লেখালেখি করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। তবে সক্রিয় রাজনীতি আর করবেন না বলে জানান তিনি।
বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ দেশের মানুষ আমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতি পদে দুই মেয়াদে নির্বাচিত করেছে। আবার রাজনীতি করলে এ দেশের মানুষকে হেয় করা হবে। সেটা আমি করব না। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, আপনারা শুনেছেন, অনেক সময় আমি বলেছি, আমি বন্দি জীবনে আছি। এর থেকে আমি মুক্তি পাচ্ছি। এখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, আমি সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি। মানুষের বাইরে কোনো চিন্তা ছিল না। কোনো দিন থাকবেও না। আমি দেশের সব রাজনীতিবিদদেরও এ কথাই বলব, এ দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে যেন তারা রাজনীতি করেন। তাহলে রাজনীতি আরও অনেক সুন্দর হবে। দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে আমি এটি আশা করি। আবদুল হামিদ আশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পালন করবেন, এটা সারা জাতির প্রত্যাশা, আমারও প্রত্যাশা। এরপর বিদায়ী রাষ্ট্রপ্রধানকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তারপর বঙ্গভবন ছেড়ে রাজধানীর নিকুঞ্জের নিজ বাসায় যান তিনি। বর্ষিয়ান এ রাজনীতিক এখন থেকে সেখানেই অবস্থান করবেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।