অশোধিত তেলের চড়া মূল্য আঘাত করছে ঘুরে দাঁড়ানো বিশ্ব অর্থনীতিকে। এর আগে গোটা অর্থনীতির গতি আটকে দিয়েছিল কোভিড-১৯ মহামারি। বড় দুটি প্রতিঘাত থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশও। এতে কমেছে প্রবৃদ্ধির হার ও রাজস্ব আয়। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, পরিবহণ, পর্যটনসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও পুরোপুরি ধকল কাটেনি। এই ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে সরকার ২১৩১ কোটি টাকা বা ২৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নিচ্ছে। এটি নেওয়া হবে এশিয়ান ইনফ্রাকস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে। পুরো প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এআইআইবির সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে ঋণের সুদের হার, পরিশোধের সময়সহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করেছেন। ঋণের মেয়াদ হবে ২০ বছর। থাকবে ৩ বছরের গ্রেস পিরিয়ড।
ঋণের অর্থ দিয়ে মোট দেশজ উৎপাদন (ডিজিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যেসব উপদান সহায়ক ভূমিকা পালন করবে সেখানে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে নীতিগত সংস্কার করা হবে। পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কার ও শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনা হবে। ঋণের অর্থ দিয়ে সম্প্রসারণ করা হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। পাশাপাশি সহায়তা দেওয়া হবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে। যারা কোভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঋণের অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় হবে তার ওপর নির্ভর করবে এর সুফল। করনীতি সংস্কারের দরকার আছে। পাবলিক ফাইন্যান্সিং ম্যানেজমেন্ট সংস্কারের প্রয়োজন আছে। ফলে ঋণ আনা নিয়ে আপত্তি নেই। প্রশ্ন হলো এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ভর করবে সফলতা। সঠিকভাবে ঋণ ব্যবহার না হলে মূল কাজের পরিপূর্ণতা পাবে না।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এআইআইবি থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে পারলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। কারণ এসব ছোট উদ্যোক্তা একেবারেই বসে গেছে। এখন সহায়তা ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারা যুক্ত হতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে নীতিগত সংস্কার দরকার আছে। গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে কর আহরণ কমে গেছে। এক্ষেত্রে করনীতি সংস্কার ও রাজস্ব আহরণের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। ঋণের অর্থ দিয়ে এই সংস্কারগুলো করা হলে রাজস্ব আহরণে পরিবর্তন ঘটবে। এছাড়া পাবলিক ফাইন্যান্সিং ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কারে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। তবে ইতঃপূর্বে আরও কয়েকবার এসব খাত সংস্কারে অর্থ ব্যয় করা হয়। এরপরও একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে কেন দাঁড়াতে পারেনি।
জানা গেছে, এআইআইবির কাছ থেকে এই ঋণ নেওয়ার জন্য নেগোসিয়েশন করতে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সম্প্রতি বৈঠক করেছে এআইআইবির সঙ্গে। বৈঠকে ঋণ কমিটমেন্ট ফি প্রতি বছর দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
অবশ্য অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে এর আগে প্রধানমন্ত্রী ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা। যদিও প্রথম দফায় ঘোষিত ২৩টির মধ্যে ৫টি প্যাকেজের বাস্তবায়নের হার খুবই শোচনীয়। এগুলো হলো যথাক্রমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্পের দুস্থ শ্রমিক, রপ্তানিমুখী শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজীবী ও করোনা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের বিমা। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। কিন্তু গত জুন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৮০৪ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এটি অবশ্যই হতাশাজনক। অন্য প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নাধীন আছে।
জানা গেছে, বিদেশ থেকে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এর বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হবে নীতিগত সংস্কারে। বিশেষ করে পাবলিক ফাইন্যান্সিং ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কার করা হবে। অর্থমন্ত্রণালয় এই পিএফএম বাস্তবায়নে ২০১৮-২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত একটি অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করেছে। রাজস্ব ব্যয়ে গুণগত মান, অভ্যন্তরীণ রিসোর্স ব্যবহার, ঋণ ব্যবস্থাপনার সংস্কার, সরকারি বিনিয়োগে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নানা উদ্যোগের কথা বলা আছে।
জানা গেছে, পাবলিক ফাইন্যান্সিং ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কারে বিগত ১৯৯০ সাল থেকে নানা নামে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কখনো কোর-ব্যাক, কখনো রি-ব্যাকসহ বিগত ৩১ বছরে নানা নামে সংস্কার করা হয়। উদ্দেশ্যে ছিল সরকারের ব্যয়ে গুণগত মান নিশ্চিত করা, অপচয় হ্রাস ও সরকারের বিনিয়োগে আরও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ করাও এর লক্ষ্য ছিল। তবে দৃশ্যমান সেগুলো এখন দেখা যাচ্ছে না। এসব কর্মসূচি কেন ব্যর্থ হয়েছে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। না হলে একই অবস্থা হবে বিগত সময়ে নেওয়া কর্মসূচির মতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে সেটি ভালো। কিন্তু এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ভবন নির্মাণ, ভ্রমণ ব্যয়, কনসালটেন্সি নিয়োগে ব্যয় বেশি করা হয়। এতে মূল কাজের পরিপূর্ণতা পায় কম। মনে রাখতে হবে যেভাবেই ঋণ নেওয়া হোক সেটি পরিশোধ করতে হবে। ঋণ নিয়ে সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে।