ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে। এতে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে আমদানিকৃত পণ্য মজুতের গোডাউন কার্গো ভিলেজ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এনিয়ে গত ৫ দিনের ব্যবধানে পরপর তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের কারণে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হওয়ায় যেসব ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কথা ছিল, সেসব ফ্লাইট কলকাতা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিমানবন্দরে অবতরণ করে। রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে জানানো হয়, আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। রাত ৯টা ১৮ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট ওঠানামা পুনরায় শুরু হয়।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) বেলা সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের (আমদানিকৃত পণ্য মজুত স্থান) কুরিয়ার গোডাউনে আগুনের সূত্রপাত হয়। নিমিষেই আগুন পৌঁছে যায় ইলেকট্রনিক্স গোডাউনে। আগুন কেমিক্যাল গোডাউনে গেলে তা প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিমানবন্দরের পুরো আমদানি কার্গো ভিলেজে। কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আকাশ। আগুন নেভাতে উন্নত প্রযুক্তি রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং রোবট ব্যবহার করা হয়। হঠাৎ এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিমানবন্দরের সব ধরনের ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনাসহ জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আগুনে ফায়ার ফাইটার ও আনসার সদস্যরা আহত হন। এদের মধ্যে ২৫ জনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে বিপুল পরিমাণ মালামাল। প্রাথমিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঘটনার পরপরই বিমানবন্দরের ফায়ার সেকশন, বিমানবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী সম্মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম শুরু করে। খবর পেয়ে বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট বিমানবন্দরে যায়। এরপর আশপাশের ১৩টি ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট একে একে আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। এছাড়া সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণসহ ঘটনাস্থলের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের জনান, আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি শুধু আমদানি কার্গো শাখায় সীমাবদ্ধ ছিল। রপ্তানি কার্গো নিরাপদ রয়েছে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব বিমানবন্দরের ফ্লাইট ও কার্গো কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। দুর্ঘটনার কারণে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে বলে তিনি জানান।
বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ফলে আশপাশে দীর্ঘ এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উত্তরায় অতিরিক্ত ৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মহিদুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কার্ডধারী ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আমরা পুরো এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছি, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। এছাড়া উত্তরা বিভাগের ছয়টি থানার পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরাও সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
আব্দুর রহমান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেন, শুরুতে আগুন কম ছিল। বিমানবন্দরে থাকা ফায়ার স্টেশনের সদস্যদের কাজ করতে দেখা যায়নি। বাইরে থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আসে বেশ কিছু সময় পর। কিন্তু তারা এসে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করতেই গোডাউনের কেমিক্যালে আগুন ধরে যায়। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিকাল সাড়ে ৩টায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওসার মাহমুদ জানান, ‘বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।’ এরপর ঢাকাগামী বেশ কয়েকটি ফ্লাইটকে বিকল্প রুটে পাঠানো হয়। এদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও ট্যাক্সিওয়েতে আটকে রাখা হয়।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তাহলা বিন জসিম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং রোবট ব্যবহার করা করা হয়েছে। এটি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। দ্রুত আগুন যেন নিয়ন্ত্রণে আসে, সেজন্য এই রোবট ব্যবহার করা হয়। তিনি আরও জানান, কারখানা, গুদাম বা তেল-গ্যাস স্থাপনার আগুন নেভানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানে ফায়ার ফাইটারদের পক্ষে সরাসরি প্রবেশ করা বিপজ্জনক। এজন্য রোবট ব্যবহার করা হয়। এটি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালানো হয়। এর শক্তিশালী ফ্যান ও পানির জেট দিয়ে এটি আগুন নিয়ন্ত্রণে এবং ধোঁয়া ও গরম বাতাস দূর করতে সাহায্য করে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, বিমানবন্দরের ইমপোর্ট কার্গো এলাকার ৮ নম্বর গেটের পাশে বিভিন্ন কোম্পানির আমদানিকৃত কেমিক্যাল, গার্মেন্ট, ইলেকট্রনিকস ও মেশিনারিজ পণ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রায় এক হাজার আনসার সদস্য ঘটনাস্থলে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন। এ সময় কর্তব্যরত অবস্থায় ১৫ জন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের সিএমএইচ ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যান। এ সময় বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শুধু কাঁচামাল পুড়ে যায়নি, অনেক এয়ার শিপমেন্ট শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। এই আর্থিক ক্ষতি কীভাবে পোষাবে, এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কিছু জানা যায়নি। তিনি আরও বলেন, পোশাকশিল্পের কত টাকার কাঁচামাল আগুনে পুড়েছে, তার হিসাব কষা হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম মিঠু সাংবাদিকদের বলেন, আগুন লাগার এক ঘণ্টা পর সিভিল এভিয়েশন ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিতে চাইলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরাপত্তার কারণে কাউকে অংশ নিতে দেননি। কারণ কার্গো ভিলেজে অস্ত্র, গোলাবারুদ, রাসায়নিক দ্রব্য ও গার্মেন্ট পণ্য ছিল। তিনি আরও বলেন, কত কোটি টাকার পণ্য পুড়েছে, তা প্রাথমিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, এটা নিশ্চিত। কেননা বিমানে জরুরি ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করা হয়ে থাকে। কার্গো ভিলেজে মূল্যবান গুদামও রয়েছে। সেখানেও মূল্যবান পণ্য ছিল। বিমানবন্দরে কার্গো ব্যবস্থাপনা কবে চালু হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের বলেন, ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিকে আগুন লাগার পর ঢাকা কাস্টমস কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এনবিআর ও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরেও চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, কার্গো ভিলেজের অবকাঠামো অনেক পুরোনো। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখানে নেই।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বিমানের ফ্লাইট সেফটি চিফ। সদস্য হিসাবে থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বিমানের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট সেফটি অ্যান্ড কোয়ালিটি), চিফ ইঞ্জিনিয়ার (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স), উপমহাব্যবস্থাপক (সিকিউরিটি) ও উপমহাব্যবস্থাপক (কার্গো-রপ্তানি)। আর সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিমানের উপব্যবস্থাপককে (ইন্স্যুরেন্স)। কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সুপারিশমালা পেশ করতে হবে।