মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মানচিত্র ফের আঘাত হানছে সর্বনাশা পদ্মা। অসময়ে পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় হঠাৎ নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে উত্তাল ঢেউ আর প্রবল স্রোতের কারণে অসময়ের এই ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে পদ্মা নদী ঘেঁষা উপজেলার আশপাশের গ্রাম ও বসতভিটা। গত ১ সপ্তাহে ইতোমধ্যে ২টি বসতভিটা বিলীন হয়েছে। সর্বনাশা পদ্মার ছোবলে প্রতিবছরই আঘাত হানছে আড়াই লাখ জনসংখ্যার বসবাসরত লৌহজং উপজেলার মানচিত্রে। উপজেলার কনকসার ইউনিয়নের সিংহেরহাটি গ্রাম ও লৌহজং-তেউটিয়া ইউনিয়নের বড় নওপাড়া গ্রামের ১নং ওয়ার্ডে সপ্তাহ খানেক যাবত ভাঙন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে হোসেন মোল্লার ৪’শ বছরের পুরনো ভিটেবাড়ি ভেঙে যায়। পরে তরিগরি করে ঘরটি ভেঙে অন্য স্থানে সরিয়ে রাখা হয়। মিঠু মোল্লার একটি ঘরের আংশিক পদ্মার গর্ভে চলে গেছে। ১নং ওয়ার্ড বড় নওপাড়া গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কখন পদ্মায় গিলে খায় সে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীর পাড়ের মানুষ।
রোববার ও সোমবার দুপুরে ভাঙনপ্রবণ এলাকা দুটিতে গিয়ে দেখা যায়, নওপাড়া গ্রামের হোসেন মোল্লা ও মিঠু মোল্লা তাঁদের কয়েকশ বছরের ভিটেমাটি ভেঙে যাওয়ায় সেসব অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় ফরিদ মাঝি বলেন, গত তিন দশক ধরে দেখছি- প্রতিবছর গ্রামের পর গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গৃহবধূ ফাতেমা বেগম জানান, ১৭ বছর যাবত বিয়ে হয়েছে। আশপাশে নদী দেখিনি। এখন নদীর প্রতিটি ঢেউ কানে বাজে। ঘরবাড়ি ভাঙনের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয়, এই বুঝি পদ্মায় গিলে খাবে ঘরবাড়ি। আমরা দ্রুত এ ভাঙ্গনের স্থায়ী সমাধান চাই । নদী ভাঙনের মুখে থাকা দানেশ মোল্লা জানান, গত তিন দিনে ৫০ হাজার টাকার বাঁশ-খুঁটি ও বালুভর্তি ব্যাগ ফেলে ভাঙন থেকে বাড়িঘর রক্ষার চেষ্টা করছি। আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রায় ২৫ বছর যাবত আমি এই বাসায় থাকি। আমার বাসার বিল্ডিং ভেঙে যাচ্ছে। সামনের বাড়িঘর সব পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। আমরা অহন কোথায় যামু। ফরিদ মাঝি বলেন, গত ৩ দশক যাবত দেখছি প্রতিবছর গ্রামের পর গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মাত্র ছয় দিন আগে (১৮ মে) উপজেলার শামুরবাড়ি ও হাড়িদিয়া গ্রামে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বাঁধ নির্মাণ নিয়ে উপজেলাবাসীদের মধ্যে যখন আনন্দের বন্যা বইছে, ঠিক তখনই হঠাৎ নদী ভাঙন দেখা দেওয়ায় আবার হতাশ হয়ে পড়েছেন তাঁরা। খবর পেয়ে রোববার ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল আউয়াল জানান, ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা এসে ছবি তুলে নিয়ে গেছে। তাদের দ্রুত ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য বলা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী জানান, লৌহজং উপজেলার খড়িয়া থেকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘিরপাড় পর্যন্ত পদ্মার বাম তীর ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলাকায় ৪৪৬ কোটি টাকার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। খড়িয়া থেকে দিঘিরপাড় পর্যন্ত এলাকার দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হলেও শুধু ভাঙনপ্রবণ ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হবে। কিন্তু কনকসার ইউনিয়নের সিংহেরহাটি গ্রামের ভাঙন কবলিত এলাকাটি ভাঙনপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত না হওয়ায় বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তিনি অস্থায়ী ভাঙন রোধে দুএকদিনের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলার আশ্বাস দেন।#