প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি তো মাইক একটা লাগিয়েই রাখে। আবার বলে আমাদের কথা বলতে দেয় না। আমরা নাকি তাদের মিছিল-মিটিং করতে দিই না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, বেশি দূর যাওয়ার কথা নয়, ২০০১ এ থাকতে আমাদের সঙ্গে কী আচরণটা করত। আমাদের নেতাকর্মী এখানে অনেকেই আছেন, ধরে নিয়ে যেভাবে দিনের পর দিন তাদের ওপর টর্চার (নির্যাতন) করেছে, অত্যাচার করেছে, আমরা যদি তার একটা কণাও করতাম, তবে ওদের অস্তিত্বই থাকত না। থাকবে অস্তিত্ব, থাকবে না। আমরা তো ওদের খুলে দিয়েছি, যা খুশি করো। নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে আসো।
শুক্রবার (৬ অক্টোবর) গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের ৭৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর পরবর্তী এ সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই তিনি লিখিত বক্তব্যে সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন। পরে জাতীয় নির্বাচন, বিএনপির আন্দোলন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন, রিজার্ভ ও ডেঙ্গু পরিস্থিতিসহ নানা প্রসঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই প্রতিযোগিতা থাকতে হবে, বিরোধী দল থাকতে হবে। কিন্তু বিরোধী দল কে? পার্লামেন্টে একটা সিট নাই। বিরোধী দল হিসাব করে তো রাখা যায় না। যার নির্বাচন করার মতো সাহস নেই। নির্বাচন করে পার্লামেন্টে আসতে পারে না। তারা আবার বিরোধী দল কিসের? গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংসদে যাদের আসন আছে, তারাই বিরোধী দল। রাস্তায় কে ঘেউ ঘেউ করে বেড়াল, সেটাকে বিদেশে কখনো বিরোধী দল হিসাবে ধরে না। এটা সবার মনে রাখা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রে তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে কেউ কথা বলেনি
যুক্তরাষ্ট্র সফরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো কথা হয়নি। কেউ আমাকে এ ধরনের কথা জিজ্ঞাসাও করেনি। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা ২০০৭-২০০৮ সালে হয়ে গেছে। তারপর কেউ এটা চাইতে পারে? এই সিস্টেমটা বিএনপি নষ্ট করে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমি স্পষ্ট বলে এসেছি। ভোটের জন্য তো আমরা সংগ্রাম করলাম। রক্ত দিয়ে, আমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার অর্জন করে দিয়েছি। তাই আজকে আমাকে ভোটের অধিকার শেখাতে হবে না।
বিএনপির চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তো তাদের আন্দোলনে বাধা দিচ্ছি না। তারা আন্দোলন করে যাচ্ছে, লোকসমাগম করে যাচ্ছে, খুব ভালো কথা। এতকাল চুরি-চামারি করে এত পয়সা বানিয়েছিল, আর যত টাকা মানি লন্ডারিং করেছিল, সেগুলোর ব্যবহার হচ্ছে। অন্তত সাধারণ মানুষের হাতে কিছু টাকা তো যাচ্ছে। আমি কিন্তু ওভাবেই বিবেচনা করি। তারা যত আন্দোলন করবে, সাধারণ মানুষের পকেটে কিছু টাকা যাবে। এই দুঃসময়ে সাধারণ মানুষ কিছু টাকা পেলে তো ভালো। এই টাকাগুলো তো বেরোনো দরকার। সেই টাকাটাও বের হচ্ছে, মানুষও কিছু পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনও করতে থাকুক। তবে হ্যাঁ, আমি আগেও বলেছি, যদি মানুষের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে, ওই রকম অগ্নিসন্ত্রাসের মতো কিছু করে, তখন ছাড়ব না। আমাদের সঙ্গে জনগণ আছে। আমাদের কিছু করা লাগবে না। জনগণকে ডাক দিলে তারাই ঠান্ডা করে দেবে। যখন অগ্নিসন্ত্রাস করেছে, তখন সাধারণ মানুষই ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, এবারও তাই হবে। প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন বিএনপি এত টাকা কোথা থেকে পায়, সেই খবর যাতে নেওয়া হয়।
বিএনপির জন্ম অবৈধভাবে, টিকেও আছে মিথ্যার ওপর
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বলেছে খালি হাতে এসেছি, এ নিয়ে কোনো উত্তর দিতে চাই না। শুধু দেশবাসীকে বলতে চাই, বিএনপির নেতারা মাইক একখান লাগিয়ে কী হারে মিথ্যা কথা বলে, সেটা আপনারা জেনে নিন। মিথ্যা বলা যে তাদের অভ্যাস। সবকিছুই যে খাটো করে দেখার চেষ্টা, এটা সম্পর্কে যাতে দেশবাসী সচেষ্ট থাকে। তারা যা বলে, সব মিথ্যা কথা বলে। এই মিথ্যা কথায় কেউ কান দেবেন না। মিথ্যা কথা কেউ বিশ্বাস করবেন না। দেশবাসীর কাছে এটাই আহ্বান। ওদের জন্ম হয়েছে অবৈধভাবে, টিকেও আছে মিথ্যার ওপর। আর কোনো শিকড় তো নেই।
অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমিই তাদের বলেছি
নির্বাচন নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, সন্দেহ হয় রে সন্দেহ হয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরও হঠাৎ অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে নিয়ে সবার এত মাতামাতি কেন? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের উন্নতিটা হচ্ছে। এখন এত প্রশ্ন আসে কেন, সেটাই আমার কথা। এখন একটা দেশ এত দ্রুত উন্নতি করেছে, সেটাই মানুষের মাথাব্যথা হয়ে গেল কিনা? সেটাকে এখন কীভাবে নষ্ট করা যায়, এই সন্দেহটা আমারও আছে।
ভোট ডাকাতদের কাছে শুনতে হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের নিজেদেরও একটা দোষ আছে। আমাদের দেশে কিছু লোক নির্বাচন নিয়ে বেশি কথা বলি। যারা (বিএনপি) নির্বাচন বয়কট করেছে, কলুষিত করেছে, ভোট চুরি করেছে, ভোট ডাকাতি করেছে তাদের কাছ থেকে শুনতে হয় অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা। এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য। এ সময় নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভয়াল অগ্নিসন্ত্রাস-নাশকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী সুশীল সমাজের সমালোচনা করে বলেন, কিছু স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদসহ অনেকে বললেন, মেগা প্রজেক্ট আমরা করেছি। কিন্তু দরিদ্রদের জন্য নাকি কিছু করিনি। এরকম বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তারা বাংলাদেশটাকে দেখেনি। তারা ঘরের ভেতরেই আছেন। শুধু টেলিভিশনটাই দেখেন। দিন-দুনিয়া তাকিয়ে দেখেন না। প্রধানমন্ত্রী এ সময় দারিদ্র্যবিমোচনসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তার ফিরিস্তি তুলে ধরেন।
বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত খাদ্যমন্দা
সাম্প্রতিক বিভিন্ন দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত খাদ্যমন্দা। এটা কেউ বলবে, কেউ বলবে না। আমি নিজেই তো কয়েকটা দেশ দেখলাম। সেখানে যে কী অবস্থা আমরা জানি। ওয়াশিংটনে তো বাজার-টাজার করে আমরা রান্না করে খেয়ে আসছি। এক পিস মাছ কিনতে বা দুই টুকরো মুরগি কিনতে কত শত টাকা খরচ হয় সেটা তো আমরা নিজে দেখে আসছি। কিন্তু আমরা মানুষের পাশে আছি। যাতে মানুষের কষ্ট না হয়।
সব বন্ধ করে বসে থাকি, রিজার্ভ ভালো থাকবে
রিজার্ভ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যদি বলে রিজার্ভ রক্ষা করতে হবে, তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেই, পানি দেওয়া বন্ধ করে দেই, সার দেওয়া বন্ধ করে দেই। সব বন্ধ করে বসিয়ে রাখি, আমাদের রিজার্ভ ভালো থাকবে। তিনি বলেন, করোনার সময় আমদানি বন্ধ ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। তখন তো রিজার্ভ বেড়েছিল। এরপর যখন সব খুলে গেল, সবকিছু আমদানি শুরু হলো। তখন রিজার্ভ কমবে, এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা যখন ২০০৯ সালে সরকার গঠন করি, তখন রিজার্ভ ১ বিলিয়নও ছিল না। ছিল শূন্য দশমিক সাত। আমি যখন ৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন রিজার্ভ ছিল বিলিয়নের নিচে। যেটুকু বেড়েছে, আমাদের সরকারই বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করে বলেন, রিজার্ভ বেশি রাখা বেশি প্রয়োজন, নাকি দেশের মানুষের ভালো, মানুষের জন্য কাজ করা বেশি প্রয়োজন?
বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করলে বেশি দামে কিনতে হবে
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা তো ভর্তুকি দিচ্ছি। কেন আমরা ভর্তুকি দেব। বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেছে সবাই, ভর্তুকির সুযোগ নিচ্ছে অর্থশালী বড়লোকরা। এখন একটা স্লট ঠিক করব কতটুকু সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের জন্য আলাদা দাম। তার থেকে বেশি যারা করবে তাদের জন্য আলাদা দাম। ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি ওইভাবে একটা স্লট করতে। যে বেশি ব্যবহার করবে, তাকে বেশি দামে কিনতে হবে। আর বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব। ইলেকশনের পর যদি আসতে পারি, তাহলে আবার করব। সব গুছিয়ে দেওয়ার পর এখন ইলেকশনের কথা, ভোটের কথা, অর্থনীতির পাকা পাকা কথা শুনতে হয়। আমি এসব শুনতে রাজি না।
মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যদের মনোনয়ন দেব
দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে কী কী অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাই বিবেচনা করব। প্রতি ৬ মাস পরপর আমি কিন্তু সার্ভে করি। কারও পজিশন খারাপ হলে সরাসরি মুখের ওপর বলে দিই। আমরা এ ব্যাপারে সচেতন বলেই নির্বাচনে জনগণের আস্থা ও ভোট পাই এবং জয়ী হই। তিনি আরও বলেন, জনগণের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, যারা সংসদ-সদস্য আছেন তারা কতটুকু জনগণের জন্য কাজ করেছেন, তাদের আস্থা, বিশ্বাস কতটুকু অর্জন করেছেন, সেটাকেই বিবেচনা নেই। সেটা বিবেচনায় নেই বলেই আমরা (আওয়ামী লীগ) নির্বাচনে জয়ী হয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে পারি। আমাদের সংসদ-সদস্য, মন্ত্রীরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ না করত, তাহলে বাংলাদেশের এত পরিবর্তন হতো না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন গণসচেতনতা
ডেঙ্গুসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু নিজের ঘরবাড়ি না, ছাদ থেকে শুরু করে আশপাশের অঞ্চলেও প্রত্যেকটা এলাকাভিত্তিক সবাই যদি একটু উদ্যোগ নেয় তাহলে ডেঙ্গুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটা হলো বাস্তবতা। তিনি বলেন, বিভিন্ন সিজনে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এখানে কিন্তু প্রত্যেকের নিজেদের সচেতন হতে হবে। নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, কোথায় মশাটা জন্মাচ্ছে সেই জিনিসটা দেখা। শুধু নিজের ঘরে না, নিজের ঘরের বাইরেও রাস্তায় বা আশপাশে পাড়া-প্রতিবেশী মিলেই কিন্তু মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো যেন তৈরি হতে না পারে এ ব্যাপারে সবার কিন্তু দায়িত্ব থাকতে হবে। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অবশ্যই প্রচেষ্টা আছে, প্রচেষ্টা চলছে। গবেষণাও চলছে। ইতোমধ্যে শুনলাম জাপান নাকি একটা টিকা আবিষ্কার করেছে। এগুলো তো আসলে সময়সাপেক্ষ।
শুধু নিজে পয়সা কামালে হবে না, সাংবাদিকদেরও দেখতে হবে
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যম মালিকদের উদ্দেশে বলেন, বেসরকারি চ্যানেল ও পত্রিকার মালিকদের মধ্যে অনেকে এখানে বসেও আছেন, এটা তো তাদের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। শুধু নিজেরা পয়সা কামালে হবে না। যাদের দিয়ে কাজ করাবেন তাদের ভালো-মন্দ দেখতে হবে। মালিকদের আমি বলব, ওয়েজবোর্ড কার্যকর করে দিয়েন। সাংবাদিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের জন্য সার্ভিস দিয়ে থাকে, কাজ করে। তাদের ভালো-মন্দ আপনাদের তো দেখতে হবে। তিনি বলেন, মালিকদের আবার কমিটি আছে, তারা আবার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু মেসেজ দেওয়ার আমরা দেব। এখানে মালিকদের যা করার তা করা উচিত।