নব্বই দশকের একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের সংলাপ ছিল “ভাবতে ভালো লাগে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে”। সত্যিই কি তাই? আমরা বাঙালী জাতি নাকি বীরের জাতি! দেশপ্রেমিক, অত্যন্ত অতিথি পরায়ণ ও ধর্ম ভীরুসহ নানা উপাধীতে সমৃদ্ধ আমাদের ঝুলি। তাইতো ছোট আয়তনের এই দেশে নানা বর্ণ-গোত্র ও নানান মতাদর্শী হাজার মানুষের একত্রে বসবাস।
অতীতের ইতিহাস কিংবা বর্তমান পরিস্থিতি যেটাকেই উদাহরণ হিসেবে ধরি না কেন দেশে এক একটা বিপর্যয় ঘটে আর আমাদের হাজার রকমের মানুষদের কার্যকলাপ কখনো আমাদের হাঁসায়, কখনো কাঁদায় ।
সম্প্রতি করোনা নামক মহামারীতে অনেকের বর্তমান কার্যকলাপ অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে রীতিমতো আমাদের বাকরুদ্ধ করে ফেলেছে।
দুনিয়াজুড়ে করোনার ছোবলে লাশের মিছিল যখন দীর্ঘ হচ্ছিল তখন বাংলাদেশের মন্ত্রী বলছেন, “করোনা এমন কোন শক্তি নয় যাকে পরাজিত করা যাবে না। আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী”। কেউ বলছেন, করোনা কোন মারাত্মক রোগ নয়, এটা সর্দি-কাশির মতো।
করোনাক্রান্ত রোগী হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেল। আর আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশী ভাইদের কথা কী আর বলবো? এই মহামারীতে বাংলাদেশে না আসার শত অনুরোধ করার পরও সাহসী দেশ প্রেমিকরা দেশে আসলো। প্রবাসীরাতো আবার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ! তাদের কি নিয়ম মানা সাজে? তারা কোয়ারেন্টানে থাকতে নারাজ। প্রশাসন থেকে জোরালো ব্যবস্থা নেয়ার পর তারা নিজের মাতৃভূমিকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলো।
এতো টাকা-পয়সা খরচ করে করোনাকে দেশে এনে তা যদি ছড়িয়ে না দেয় তা কি হয়? তাইতো কেউ গেল শশুর বাড়ি, কেউ করলো বিয়ে। কেউবা আত্নীয়স্বজনদের দাওয়াত করে করোনাকে পৌছে দিল সবার বাড়ি।
করোনার বিস্তার রোধে সরকার যখন সারাদেশের অধিকাংশ জেলা লকডাউন ঘোষণা করলো তখন দীর্ঘ ছুটিতে ঝাঁকে-ঝাঁকে মানুষ শহর থেকে গ্রামে করোনাকে ছড়ালো। অবকাশ যাপনের জন্য অনেকেই ভীড় জমালো সমুদ্র বিলাসে। কিন্তু সরকার কি কখনো বলেছে, ছুটি দিলাম সবাই যার যার বাড়ি যান ছুটি উপভোগ করুন!
জাতি হিসেবে আমরা অসাধু হলেও আবেগী একটু বেশিই। তাইতো নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এতোটাই মরিয়া যে নিজের ভুল বা আবেগ সংবরণ না করার কারণে দেশের বা দেশের মানুষের কতোটুকু ক্ষতি হল তা ভেবে দেখার সময় পাই না।
আমরা উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখি, সরকারি নির্দেশনা আসার পূর্বেই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে তারা নিজেরাই অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে।
পক্ষান্তরে আমাদেরকে যতোই বলা হোক না কেন আমরা তা না শুনে দোষারোপ করি সরকারকে। আমরা এমন এমন কাজ করি যা সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। শুধু সরকারকে দোষ দিলেই হবে না আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। তবে সরকার তার ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারবে না।
সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় হাজারো জনতার ঢল নামে জানাযার নামাজকে কেন্দ্র করে। তখনো আমরা সরকারকে দোষারোপ করি। সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে যারা এখনো ঘরের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তার জন্যও বলছি সরকারের দোষ !
করোনা মহামারীর সময়ে বেঁচে থাকাই যেখানে অনিশ্চিত তখন বাংলাদেশে চলছে চুরির মহাউৎসব। জেলা-উপজেলার চেয়ারম্যান, মেম্বার, দলীয় কিছু নেতা-কর্মী ত্রাণের চাল ও তেল চুরি করছে। আমাদের ভদ্রবেশী চোরেরা হয়তো জানে না গরিবের হক আত্মসাৎ করা কতটা জঘন্য ও ঘৃণীত।
আসলে আমাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো আমরা এক হাতে মানুষ ঠকাই, অন্যের হক নষ্ট করি, ঘুষ খাই, চুরি করি, আরেক হাতে টুপি নিয়ে মসজিদে যাই। এই হল আমাদের সততা ও উদারতা। আমরা মরবো কিন্তু লোভ সংবরণ করবো না।
আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে অনেক। তাইতো কেউ কেউ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সাথে তুলনা করে। করোনা নামক দুর্যোগ না এলে আমরা হয়তো জানতেই পারতাম না বাংলাদেশ নামক সিঙ্গাপুরের আসল চিত্র।
আমরা শিক্ষিত হয়েছি সত্যি কিন্তু হারিয়েছি আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মুল্যবোধ।
যতোদিন আমরা বেঁচে থাকবো, ততোদিন আমাদের আশাও বেঁচে থাকবে। তাই নিজেকে বদলানোর সময় ফুরিয়ে যায়নি। বদলানোর জন্য বয়স কখনোই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। আমি জানি, আমরা বদলালেই বাংলাদেশ বদলাবে। আমরা কি পারি না লোভ-লালসা ভুলে মানবতার দুয়ার খুলতে? আমরা কি বদলাতে পারি না?
আসুন আজ থেকে আমরা বদলাই।
লেখক-
ফ্রান্স প্রবাসী।