হামাসের আকস্মিক আক্রমণের পরপরই শনিবার রাত থেকেই ভয়ংকর হয়ে উঠা ক্ষিপ্ত ইসরাইল সেনারা হামাস নিধনের নামে মিনিটে মিনিটে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে পুরো গাজা। সীমান্তে মোতায়েন করেছে শত-শত ট্যাংক। চার লাখেরও বেশি সেনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ৪৫ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের প্রায় ২৩ লাখ মানুষের ওপর। মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) নতুন এক হুঁশিয়ারিতে সব গাজাবাসীকে ভিটেবাড়ি, নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে পরদেশি প্রতিবেশী মিসরে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল ইসরাইল সেনাবাহিনী। ইসরাইলের প্রধান সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিচার্ড হেচট এ আদেশ দেন। সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরার।
সংবাদ সম্মেলনে রিচার্ড হেচট বলেন, ‘আমি অবগত যে রাফাহ ক্রসিং (গাজা-মিসর সীমান্তে) এখনো খোলা রয়েছে। যে কেউ বাইরে যেতে পারে, আমি তাদের বাইরে বের হওয়ার নির্দেশ দেব।’ ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে ইসরাইলের এ বার্তার পরপরই সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে মিসর। দেশটির এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই গাজার সঙ্গে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করছে। এর কিছুক্ষণ পরই রিচার্ড হেচটের পূর্ববর্তী মন্তব্য সংশোধন করা হয়। এ ঘটনার পর তার অফিস থেকে একটি নতুন বিবৃতি সামনে আসে।
নতুন বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্পষ্টকরণ: রাফাহ ক্রসিং গতকাল খোলা ছিল, কিন্তু এখন এটি বন্ধ।’ ইসরাইলি হামলার পর ভয়ে তটস্থ হয়ে দিন কাটছে গাজাবাসীর। ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের স্ট্র্যাটেজি ডিরেক্টর মাহা হুসাইনি বলেছেন, ইসরাইলি বোমা হামলা থেকে বাঁচতে গাজার বাসিন্দাদের কোথাও যাওয়ার নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘গত রাতে, অনেক আবাসিক এলাকা টার্গেট করা হয়েছে। স্ট্রিপের দক্ষিণ অংশ আক্রমণ বেড়ে চলেছে। কিছু কিছু এলাকা পুরোপুরি খালি করা হয়েছে। প্রায় ৫০,০০০ বাসিন্দাকে তাদের বাড়িঘর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে করে ইসরাইলি বাহিনী পুরোদমে বোমাবর্ষণ করতে পারে। পুরো আশপাশের এলাকাগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে। এখন মানুষের যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের কোনো আশ্রয় নেই।’
অসহায় ভুক্তভোগী গাজা বাসিন্দা ইমান বাশার বলেন, ‘আমাদের কাছে পানি নেই। আমার বাবা-মা আমার ফোন কলের উত্তর দিচ্ছেন না। আমি জানি না আমার মামাদের কী হয়েছে। গত রাতে, আমি তাদের সন্ধানে কাটিয়েছি। আমার স্বামী দূরে আছেন এবং আমি একাই বেঁচে আছি। আমি অসহায় বোধ করছি।’
মানুষ এখন একটি টার্গেটেড এলাকা থেকে এমন এলাকায় যাচ্ছে যেটা পরবর্তীতে টার্গেট করা হবে।’ অবরুদ্ধ গাজায় বিমান এবং কামান হামলার পর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১৮৭,৫১৮ ছাড়িয়েছে। উদ্বাস্তুদের মধ্যে ১৩৭,৪২৭ জনেরও বেশি ‘উএনআরডব্লিউএ’ (ফিলিস্তিনিদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থা) আশ্রয় নিচ্ছে। বিমান হামলায় পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি বিভিন্ন সুবিধা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, গাজা শহর এবং উপত্যকার উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় ৪ লাখের বেশি পরিসেবাকে ক্ষতিগ্রস্তু হয়েছে। ক্রমবর্ধমান হামলায় গাজায় চলছে মৃত্যুর মিছিল। যত্রতত্র মিলছে লাশ। আহত-নিহতদের উপচে পড়া ভিড়ে জায়গা সংকটে পড়েছে গাজার হাসপাতালগুলো। ঔষধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতিরও দেখা দিয়েছে ঘাটতি। আহত সেবা দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মেধাত আব্বাস বলেছেন, ‘আমাদের হাসপাতালের পরীক্ষাগারগুলো পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরবরাহ এবং রি-এজেন্টের ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি খুবই কঠিন এবং জটিল। আমরা হাজার হাজার আহত পেয়েছি। এটি স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সুবিধা মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।’ হামাসের হামলার পর পৈশাচিক রূপ নিয়েছে ইসরাইলের আক্রমণ। শারীরিকভাবে জখম মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা পেতেও দেওয়া হচ্ছে বাধা। সোমবার (৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে গাজার খান ইউনুসে অ্যাম্বুলেন্স টার্গেট করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
স্বাস্থ্য পরিচালক আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমাদের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ করা হয়েছে। আমাদের ৫ জন সহকর্মী নিহত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবীদের সরানোর জন্য কোনো নিরাপদ পথ নেই।’