এস.কে.শাওন: মেয়েটি যদি ধনী পরিবারে জন্ম নিতো তাহলে হয়তো তাকে ফুল বিক্রি করতে হতো না।বঞ্চিত হতে হতো না শিক্ষা নামক মৌলিক অধিকার থেকে।অপ্রিয় হলেও সত্যি যে,মাত্র ১৩ বছর বয়সের এই মেয়েটি তাঁর পরিবারের সকল ব্যয়ভার বহন করে।বলছিলাম বৃষ্টি আক্তার হাজেরার কথা।
তাঁর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহেরর গফরগাঁও উপজেলায়।বৃষ্টির বয়স যখন ৭ বছর তখন তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে তাদের রেখে চলে যায়।এমনকি তাদের কোন খোঁজ খবরও নেয় না।আর ৭ বছর বয়স থেকেই বৃষ্টি তাঁর সংসারের হাল ধরে।বৃষ্টির মা প্যারালাইজড হওয়ায় কোন প্রকার কাজকর্ম করতে পারে না।তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বৃষ্টি সবার বড়।রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে বৃষ্টি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩ টা পর্যন্ত ফুল বিক্রি করে দৈনিক গড়ে ৪০০-৫০০ টাকা উপার্জন করে।উপার্জিত এই অর্থ দিয়েই চলে বৃষ্টির পুরো পরিবার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় দুটি রুম নিয়ে বৃষ্টিদের বসবাস।
পড়ালেখার ইচ্ছা সম্পর্কে বৃষ্টি বলেন,’ ছোডবেলায় লেহাপড়া করতে ইচ্ছা করতো খুব।কিন্তু এহন আর ইচ্ছা হয় না।ভার্সিটির কিছু ভাইয়েরা আগে এইহানে(চন্দ্রিমা উদ্যানে) পড়াইতো।পুলিশ নিষেধ করায় এহন আর পড়ায় না।’ চন্দ্রিমা উদ্যানে কর্মরত অধিকাংশ পুলিশ সদস্য পরিচিত হওয়ায় কোন প্রকার হয়রানির স্বীকার হতে হয় না বৃষ্টিকে। ফুল বিক্রির বিষয়ে সে বলেন,’ একটা ফুল নিয়া কেউ ৫ ট্যাকা,কেউ ২০ ট্যাকা আবার কেউ ৩০ ট্যাকাও দেয়।আমি ফুল লইয়্যা কারও লগে দামাদামি করি না।’
বৃষ্টির সাথে কথা শেষে কয়েক কদম পা বাড়াতেই একজন পানি বিক্রেতার দেখা মিললো।তাঁর নাম রওশন আরা। ৩৭ বছর বয়সী এই নারীর জীবনের গল্পও হৃদয়স্পর্শী। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার বিশুড়া গ্রামে।রওশনের মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হলেও ৭ বছর সংসার করার পর তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে।তখন থেকেই শুরু হয় রওশনের জীবন সংগ্রাম।গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন জীবিকার সন্ধানে।দুই মেয়ে ও এক ছেলের জননী রওশন প্রথমে ঢাকায় এসে কিছুদিন তাঁর সন্তানদের নিয়ে দিন রাত পথে ঘাটে থেকেছেন।অর্থের অভাবে কোন বাসা ভাড়া নিতে পারেননি।মাত্র ২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে পানি আর সিগারেট বিক্রি শুরু করেন।তখন চন্দ্রিমা উদ্যানে ব্রীজ তৈরীর কাজ চলছিল।এভাবে পানি আর সিগারেট বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন রওশন।
এই ব্যবসা থেকে সঞ্চিত অর্থ দিয়েই তিনি তাঁর বড় মেয়েকে বিয়ে দেন।তাছাড়াও এক মাস আগে তিনি তাঁর ছেলেকে একটি চা এর দোকান দিয়ে দেন।যদিওবা সেই ব্যবসা থেকে আশানুরূপ মুনাফা আসে না।রওশনের ছোট মেয়েটি কিছুদিন স্কুলে গেলেও এখন আর যায় না।রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলায় রওশনদের বসবাস। গ্রামে ভিটা বাড়ি থাকলেও রওশন সেখানে খুব কম যায়। এ ব্যাপারে তিনি বলেন,’ আমি ঢাহায় পার্কে বইয়া পানি সিগেরেট বেচি এইডা আমগো গেরামের কেউ জানে না।সবাই জানে আমি ঢাহায় গার্মেন্টসে চাকরি করি।পার্কে পানি বেচি,এডা গেরামের মানুষ জানলে সরম।এইলেইগ্গা জানাই না।আর গেরামেও খুব কম যাই।’
রওশনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,’ আমার জীবনডাই গেল কষ্টে।এই পানি সিগেরেটের ব্যবসা ভালো না।খুব কষ্ট অয়।কিন্তু কি করমু,প্যাটের দায়ে করন লাগে।আমার পোলাডা নতুন দোহান দিছে।দোহানডা ভালো চললে আমার আর এই ব্যবসা করুম না।দোহানেই পোলারে সাহায্য করমু।’