ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও অবরোধের ফলে গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য, পানি ও বিদ্যুতের অভাবে মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। চিকিৎসা উপকরণ ও বিদ্যুতের সংকটে চিকিৎসাসেবা বন্ধের উপক্রম। বিদেশি নাগরিক ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনিদের অবরুদ্ধ গাজা ত্যাগ ও জরুরি ত্রাণ পৌঁছানোর সুযোগ দিতে গতকাল সোমবার মিসরের রাফা সীমান্ত ক্রসিং খোলার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
রাফা ক্রসিং খোলার সম্ভাবনা ঘিরে যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়লেও উভয় পক্ষই তা নাকচ করে দেয়। চলমান সংঘাতের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়
অবরুদ্ধ গাজার লাখ লাখ বাসিন্দা ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছে। জনপদের সর্বত্র আতঙ্ক, ক্ষোভ আর হতাশা।
ইসরায়েল ত্রিমুখী অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে প্রাণ বাঁচাতে মালপত্র নিয়ে দক্ষিণে ছুটছে উত্তর গাজার বাসিন্দারা। এরই মধ্যে ঘন বসতিপূর্ণ দক্ষিণ গাজায় হঠাৎ করে কয়েক লাখ মানুষের আগমন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। পানি, খাদ্য ও জ্বালানির সংকটে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে গাজাবাসীর জীবন।
উত্তরের বড় শহর গাজা সিটির বাসিন্দা মোনা আবদেল হামিদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট কিছুই নেই।
মনে হচ্ছে মানবতা হারিয়ে ফেলেছি।’ সাবাহ মাসবাহ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পানি। পানির অভাবে আমরা কেউ কয়েক দিন ধরে গোসল করছি না।’
হামাস প্রশাসনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়াদ আল-বোজোম বলেন, গত ১০ দিন ধরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে ইসরায়েল। তাই গাজার বাসিন্দারা অস্বাস্থ্যকর পানি পান করছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটের কারণ হতে পারে।
জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডাব্লিউয়ের প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি বলেছেন, ‘গাজায় আমার সহকর্মীরা আর মানবিক সহায়তা দিতে পারছে না। আমরা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। এটা একেবারেই নজিরবিহীন।’
লাজ্জারিনির আশঙ্কা, গাজায় পানি ও বিদ্যুৎ ফুরিয়ে যাচ্ছে। শিগগির খাবার এবং ওষুধও শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই জানি পানিই জীবন। তবে গাজায় পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে ফুরিয়ে যাচ্ছে জীবন।’
গাজায় জরুরি ত্রাণ প্রবেশের বিষয়ে আলোচনা করতে আজ মধ্যপ্রাচ্য সফরের কথা রয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রধান মার্টিন গ্রিফিথসের।
অতিসত্বর সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করে ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে আরব লিগ। এ ছাড়া ফিলিস্তিনে অবস্থিত জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন।
রাফা সীমান্তে ভিড়
গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার পর থেকে অনেক বিদেশি নাগরিক ও দ্বৈত পাসপোর্টধারী ফিলিস্তিনের গাজা ছাড়তে মিসরের রাফা ক্রসিংয়ে ভিড় জমিয়েছে। এই ক্রসিং হয়ে ফিলিস্তিনে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে ত্রাণ সহায়তা বহনকারী শতাধিক ট্রাকও। সোমবার সকালে রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনার কথা বলা হলেও গতকাল পর্যন্ত তা বন্ধ ছিল। ফলে সেখানে অপেক্ষমাণ বিদেশি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ফিলিস্তিনিরা গাজাতেই আটকে আছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শোকরি বলেন, রাফা ক্রসিং খুলতে দিচ্ছে না ইসরায়েল।
কায়রো দাবি করেছে, রাফা ক্রসিংয়ের মিসর অংশে কার্যক্রম চলমান থাকলেও ইসরায়েলি বোমা হামলায় ফিলিস্তিন অংশের অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাফা ক্রসিংয়ে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিন ও জার্মানির দ্বৈত নাগরিক আহমাদ আল-কাসাস বলেন, ‘আমরা তিন দিন ধরে সীমান্তে আছি। ক্রমাগত লোকজন এখানে আসছে।’
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো সফর শেষে ইসরায়েলে ফিরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন গতকাল রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, মিসরের সিনাই উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী গাজার দক্ষিণ অংশে রাফা ক্রসিংয়ের অবস্থান। ইসরায়েলের দিকের ক্রসিংগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির খবর অস্বীকার
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মিসর রাফা সীমান্ত ক্রসিং চালুর পাশাপাশি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে খবর দিয়েছিল বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিদেশিদের বের করে নেওয়ার বিনিময়ে গাজায় কোনো যুদ্ধবিরতি হয়নি।
হামাসও বলেছে, দক্ষিণ গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। শিগগির জল, স্থল ও আকাশপথে সর্বাত্মক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। এর অংশ হিসেবে গাজা সীমান্তের আশপাশে শত শত ট্যাংক মোতায়েন করেছে তারা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও রাফায় ইসরায়েলি বোমা হামলা অব্যাহত রয়েছে। হতাহতের বেশির ভাগই শিশু।
হামাস জানিয়েছে, জেরুজালেম ও তেল আবিবকে লক্ষ্য করে রকেট ছুড়েছে তারা। তাদের দাবি, রকেট হামলায় ইসরায়েলি আইনসভা নেসেটের অধিবেশন স্থগিত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী কয়েক কিলোমিটার এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল।
বাইডেনের হুঁশিয়ারি
হামাসকে নির্মূল করার কথা বললেও গাজা উপত্যকা দখলে নেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘পুনরায় গাজা উপত্যকা দখল করা হবে সবচেয়ে বড় ভুল।’ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, এমন ইচ্ছা তাঁদের নেই।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও বাগাড়ম্বর
ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নেবেন না। একই ভুল বারবার করবেন না। কারণ এবার আপনাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে আলাপ হয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির সঙ্গেও কথা বলবেন তিনি।
ইরানকে আগুনে ঘি ঢালতে নিষেধ করেছে ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্র জার্মানি। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ফোনে আলাপ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি।
সূত্র : এএফপি, আলজাজিরা, বিবিসি