নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরিপুর বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যাংক জালিয়াতি চক্রের মূল হোতাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১১ সদস্যরা। এ সময় গুলিসহ বিদেশী পিস্তল ও বিপুল পরিমাণ ব্যাংক জালিয়াতির সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত র্যাব-১১’র ব্যাটেলিয়ন সদর দফতরের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীস্থ র্যাব-১১’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আলেপ উদ্দিন র্যাব-১১’র প্রধান কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- র্যাব-১১ এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লীডার মোঃ রেজাউল হক ও সহকারী পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- কুমিল্লার দাউদকান্দির চরচারিপাড়া এলাকার আব্দুস সাত্তারের ছেলে মোঃ ইদ্রিস মিয়া (৪৪), একই জেলার মুরাদনগরের দারোরা এলাকার মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে ইউপি সদস্য মোঃ মমিনুল ইসলাম (৪৬), একই এলাকার আব্দুল মতিনের ছেলে রুবেল (২৪) ও একই জেলার ও থানার পালাসুতার কারী আবু মুসার ছেলে আবু বক্কর সালাফী (৪৩)।

অভিযানের সময় গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ম্যাগাজিনসহ ১টি বিদেশী পিস্তল, ৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ১টি চাপাতি, ১টি চাকু, ১টি রঙ্গিন প্রিন্টার, জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত অগ্রণী, ডাচ বাংলা, সোনালী, পূবালী ও ইসলামী ব্যাংকেরসহ ভূয়া সীল ২৪টি, ১৬টি সোনালী ব্যাংকের ভুয়া ট্রান্সজেকশন ভাউচার, ২৮টি বিভিন্ন ব্যাংকের ভুয়া এক্সপ্রেস মানী রিসিপ্ট ভাউচার, ২ পাতা এনসিসি ব্যাংকের ভুয়া পেমেন্ট সিøপ, ১১ জনের ভুয়া গলাকাটা এনআইডি এবং ভুয়া এনআইডি তৈরীর ছবি-১৬টি উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১১’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আলেপ উদ্দিন পিপিএম (বার) জানান, গ্রেফতারকৃদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ব্যাংক জালিয়াতি চক্র। এ চক্রটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের প্রায় ১ কোটি টাকা জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক ৩টি (ডাকাতির প্রস্তুতি, জালিয়াতি, অস্ত্র আইনে) মামলা দায়ের করা হবে।
তিনি আরো জানান, গ্রেফতারকৃত মোঃ ইদ্রিস এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা। ৩ বৎসর পূর্বে হোটেলে কাজ করার সময় বশু ভাই নামে ভারতীয় এক সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে ইদ্রিস মিয়ার বন্ধুত্ব হয় এবং তার কাছ থেকে ব্যাংকের টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আতœসাৎ করার বিভিন্ন অভিনব কৌশল শিখে। বশু ভাই দীর্ঘদিন ধরে এটিএম বুথ হ্যাক করে বুথ থেকে টাকা উত্তোলন ও রেমিটেন্স জালিয়াতির সাথে জড়িত ছিল। সে বর্তমানে ভারতে চলে যায় বলে ধারণা র্যাবের এ কর্মকর্তার। ইদ্রিস প্রথমে যে ব্যাংকের টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আতœসাৎ করবে সেই ব্যাংক নির্বাচন করে। নির্বাচিত ব্যাংক এ প্রথমে বৈধভাবে তার পরিচিত লোক বিদেশ থেকে রেমিটে›েসর মাধ্যমে তার নামে অল্প পরিমাণ টাকা পাঠায়। সেই টাকা উত্তোলনের জন্য তাকে একটি গোপন পিন নম¦র দেয়া হয়। উক্ত গোপন পিন নাম্বার নিয়ে ব্যাংকে গেলে ব্যাংক টাকা উত্তোলনের জন্য একটি ভাউচার তৈরি করে দেয়। উক্ত ভাউচার দিয়ে টাকা উঠানোর আগে ইদ্রিস তার মোবাইলে ভাউচারের একটি ছবি তুলে রাখে। মোবাইলে ভাউচারের ছবি দিয়ে তার প্রিন্টারে নতুন নতুন ভাউচার তৈরি করে তাতে নতুন রেমিটেন্স নাম্বার বসিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর এবং বিভিন্ন এনআইডি’র স্বাক্ষর নকল পূর্বক গলাকাটা এনআইডি ব্যাংক এ জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করে।
সে এভাবে অগ্রণী ব্যাংকের চাঁদপুরের সাচার শাখা ও সোনালী ব্যাংকের রহিমা নগর শাখা, অগ্রণী ব্যাংকের কুমিল্লার মুরাদনগর শাখা, বি-বাড়িয়ার মাধবপুর শাখাসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করে। প্রতারক ইদ্রিস মিয়া ২০১৮ সালে ১১ এপ্রিল অগ্রণী ব্যাংকের বুড়িচং শাখায় বিদেশ থেকে পাঠানো গোপন নম্বরের টাকা জালিয়াতি করে তুলতে গিয়ে হাতে নাতে আটক হওয়ার পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে কিছু দিন কারাগারে থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজে সক্রিয় থাকে। গ্রেফতারকৃত মমিনুল ইসলাম কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দারোরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার)। সে এই জালিয়াতি চক্রের সাথে গত ১ বছর ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে। গত ৪ মাস আগে চাঁদপুর অগ্রণী ব্যাংকের বাবুর হাট শাখায় ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের সময় হাতে নাতে আটক হয়ে জেলে যায়। ১৭ দিন জেল খেটে জামিনে আসার পর পুণরায় জালিয়াতি চক্রের সাথে সক্রিয় হয়। আবু বক্কর সালাফী ও রুবেল এই চক্রের অন্যতম সহযোগী সদস্য। এই চক্রটি ব্যাংকের টাকা জালিয়াতির পাশাপাশি পেশাদার ছিনতাইকারী, ভারাটে ক্যাডার ও ডাকাতির সাথে জড়িত বলে প্রাথমিক জিঙ্গাসাবাদে তারা স্বীকার করে। তাদের প্রতেকের নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে। #